মধ্য রাতে এক সাংবাদিককে ধরতে ৪০ জনের বাহিনী

0
50

মধ্য রাতে ঘরের দরজা ভেঙে বসতঘর থেকে টেনে হেঁচড়ে তুলে নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলামকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে কারাদণ্ড প্রদানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা রিটের আদেশ দেয়া হবে আজ সোমবার। গতকাল বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি সরদার মো. রশিদ জাহাঙ্গীরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রিটের শুনানি শেষে আদেশের জন্য এ দিন ধার্য করেন। একইসঙ্গে আরিফুল ইসলামকে দেয়া একবছরের সাজার আদেশের কপি দাখিলেরও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন ও আইনজীবী ইশরাত হাসান। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি  জেনারেল দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য।

শুনানি শেষে ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন সাংবাদিকদের বলেন, রিট আবেদনের শুনানিতে আদালতকে বলেছি, কিছু আমলারা সরকারের কাছ থেকে বেতন নিয়ে সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যই ষড়যন্ত্র করছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছু আমলা প্রধানমন্ত্রীর সেই কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করছেন। দেশের কিছু কিছু ডিসির আচরণ দেখে মনে হয় তারা মোগল সম্রাটের মতো আচরণ করছেন।

তখন আদালত সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে সাজা দেয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। আদালত বলেন, পত্রিকায় দেখলাম একজন সাংবাদিককে ধরতে মধ্যরাতে তার বাসায় ৪০ জনের বাহিনী নিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এটা তো বিশাল ব্যাপার! মনে হয় যেন দেশের সেরা সন্ত্রাসীকে ধরতে গেছে। একজন সাংবাদিকের বাড়িতে এত লোক নিয়ে গেছে? এত বড় অভিযান? নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ছিল। শুনানিকালে আদালত রাষ্ট্রপক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আইনের চোখে সবাই সমান। আইনে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত কারো বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করা নিয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে আইনে বিশেষ কারণে অভিযান পরিচালনারও সুযোগ রাখা হয়েছে। সেখানে কি কি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে তা আইনে বলা আছে। তাই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মধ্যরাতে অভিযান পরিচালনার সময় আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কী না তা জানাতে হবে। তাই সে অভিযানে কি অর্জিত হয়েছে তা জানান। এ সময় আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে সোমবারের মধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায়ের কপি, সাজা ভ্রাম্যমাণ আদালত না কি টাস্কফোর্স দিয়েছে এবং মধ্যরাতে এভাবে কারো বাসায় যাওয়ার এখতিয়ার আছে কিনা এসব বিষয়ে তথ্য জমা দিতে বলেছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ কে দিয়েছে, সেটির কোনো লিখিত তথ্য আছে কিনা তাও জানাতে বলা হয়েছে। আদালত বলেছেন, এখন ডিজিটাল যুগ। অনুলিপি দিতে না পারলেও মূল কপি স্ক্যান করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে মুহূর্তেই সব পাঠানো সম্ভব।

এরআগে আদালত রিট আবেদনকারীর এখতিয়ার ও আইনগত অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আদালত রিট আবেদনকারীর আইনজীবীর কাছে আরিফুল ইসলাম রিগানকে সাজা দেয়ার আদেশের কপি দেখতে চান। কিন্তু আইনজীবীরা তা দেখাতে পারেননি। আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, সাজার আদেশের কপি পেতে কয়েকদিন সময় লাগে। এসময় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ড. বশির আহমেদ আদালতকে বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কাছ থেকে এত তাড়াতাড়ি আদেশের কপি পাওয়া যায় না। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল দেবাশিষ ভট্টাচার্য রিট আবেদনের বিরোধিতা করে বলেন, এটা ফৌজদারি অপরাধ। এর বিরুদ্ধে রিট আবেদন করার সুযোগ নেই। যিনি ভিকটিম তাকেই মামলা করতে হয়। তখন রিটকারী আইনজীবী আদালতকে বলেন, জনস্বার্থে যে কেউ মামলা করতে পারে। এখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে। মোবাইল কোর্ট কখনো বসত ঘর থেকে টেনে হেচড়ে বেড় করে কাউকে কারাদন্ড দিতে পারে না।

তার আগে রোববার বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদের পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন। রিটে ফৌজদারি কার্যবিধি, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন এর সংবিধানের ৩১, ৩২, ৩৫ এবং ৩৬ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচিব, আইন মন্ত্রণালয় সচিবসহ ১৭ জনকে বিবাদী করা হয়। রিট আবেদনে টাস্কফোর্সের নামে আরিফুল ইসলামকে অবৈধ সাজা ও আটক করা কেন সংবিধান পরিপন্থী হবে না, আরিফুল ইসলামকে কেন ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না-মর্মে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে। এছাড়া কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক, সিনিয়র সহকারী কমিশনার, সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে তাদের ভূমিকার ব্যাখ্যা দিতে আদালতে সশরীরে হাজির হওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।

সূত্র : মানবজমিন