জ্বালানি তেলের মূল্যযুদ্ধে কার লাভ, কার ক্ষতি

0
39

কভিড-১৯ আতঙ্কে বছরের শুরু থেকেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার নিম্নমুখী প্রবণতায় ছিল। সোমবার বাজার পরিস্থিতি বড় ধাক্কা খেয়েছে। একদিনেই রেকর্ড দরপতনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ও ব্রেন্ট ক্রুডের ব্যারেল ৩০ ডলারে নেমে এসেছে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর পর এদিন জ্বালানি পণ্যটির সর্বোচ্চ দরপতন ঘটেছে। তবে এবারের আঘাত নভেল করোনাভাইরাস নয়। বরং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি পণ্যটির রফতানিকারকদের জোট অর্গানাইজেশন অব দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজের (ওপেক) সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে দরপতন রোধে ওপেক-নন ওপেক দেশগুলোকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন বর্তমানের তুলনায় কমিয়ে আনতে প্রস্তাব দিয়েছিল সৌদি আরব। ভিয়েনায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বৈঠকে এ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছে রাশিয়া। এ কারণে সৌদি আরবের হাত ধরে জ্বালানি তেলের বাজারে নতুন মূল্যযুদ্ধের সূচনা হয়েছে। মূল্যযুদ্ধের অংশ হিসেবেই জ্বালানি পণ্যটির রেকর্ড দরপতন ঘটেছে।

এখন প্রশ্ন হলো, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে সৌদি আরব-রাশিয়ার নতুন এ মূল্যযুদ্ধে আদতে লাভ কার হবে? ক্ষতির শিকারই বা হবে কারা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটু পেছনে তাকাতে হবে। বলে নেয়া ভালো, এর পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কিংবা বাণিজ্যিক কারণ নয় বরং বিশ্বরাজনীতির অনেক একক সরাসরি জড়িত।

২০১৩ সালের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। ওই সময় জ্বালানি পণ্যটির ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। পরের বছরের শুরুর দিকে জ্বালানি তেলের বাজারে রেকর্ড দরপতন দেখা দেয়। দাম কমতে কমতে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলারের নিচে নেমে আসে। এ পরিস্থিতিতে দরপতন ঠেকাতে জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক উত্তোলন সীমিত রাখার উদ্দেশ্যে চুক্তি করে ওপেক। জোটভুক্ত না হয়েও রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ চুক্তির শর্ত এখনো মেনে চলছে। কয়েক দফা বাড়ানোর পর চলতি মাসে এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের বাজার ভারসাম্যের স্বার্থেই সৌদি আরব ও রাশিয়ার এ সহযোগিতামূলক সম্পর্ক এতদিন বজায় ছিল। তিক্ততার শুরু সৌদি আরবের সাম্প্রতিক প্রস্তাবে মস্কোর অসম্মতির মধ্য দিয়ে। তবে এটা অনুমেয় ছিল। কেননা জ্বালানি তেলের উত্তোলন কম রাখা রুশ সরকারের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নীতি হলেও দেশটির জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন থেকে বাণিজ্যিক কারণে এ নীতির বিরোধিতা করে আসছে। তাই বছরের পর বছর নিজস্ব কোম্পানিগুলোর চাওয়া উপেক্ষা করা মস্কোর পক্ষে সম্ভব হবে না বলে মনে করা হচ্ছিল। আগেই একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন রুশ জ্বালানিমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক।

এ পরিস্থিতির পেছনে যুক্তরাষ্ট্র বড় একটি একক। দেশটি জ্বালানি তেলের বাজারে নব্য রফতানিকারক হিসেবে যুক্ত হয়েছে। বাজার দখলের লড়াইয়ে ইরান ও ভেনিজুয়েলাকে পেছনে ফেলতে দেশ দুটির ওপর এরই মধ্যে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ফলে ইরান ও ভেনিজুয়েলা থেকে রফতানি হওয়া জ্বালানি তেলের ক্রেতারা ওয়াশিংটনমুখী হয়েছেন। বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি তেহরান ও কারাকাসের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়া। এমনকি ভেনিজুয়েলার জ্বালানি খাতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার দায়ে সম্প্রতি রুশ প্রতিষ্ঠান রোজনেফতের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন মিত্র সৌদি আরবের সঙ্গে রাশিয়ার সাম্প্রতিক মূল্যযুদ্ধের পেছনে এটাও বড় একটি কারণ।

সৌদি আরব ও রাশিয়া ওপেকের চুক্তির আওতায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উত্তোলন কমিয়ে আনলেও যুক্তরাষ্ট্র সেই পথে হাঁটেনি। বরং ২০১৯ সালে মার্কিন উত্তোলন খাত ইতিহাসের সর্বোচ্চ চাঙ্গা অবস্থানে পৌঁছেছে। জ্বালানি তেলের রফতানি বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। এ পরিস্থিতি রাশিয়ার জন্য লাভজনক হয়নি। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের কাঙ্ক্ষিত মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারেনি ওপেক-নন ওপেক। ফলে রুশ-মার্কিন ঐতিহাসিক বিরোধ জ্বালানি তেলের বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ভিয়েনায় ওপেক-নন ওপেক বৈঠক সমঝোতা ছাড়াই শেষ হওয়ার পর সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী আবদুল আজিজ বিন সালমান বলেছিলেন, ‘সামনে আরো চমক অপেক্ষা করছে।’ তার এ মন্তব্যে জ্বালানি তেলের বাজারে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। সপ্তাহ না পেরোতেই দেশটির হাত ধরেই মূল্যযুদ্ধের সূচনা হয়েছে।

নতুন মূল্যযুদ্ধে আমদানিকারক দেশগুলো সরাসরি লাভবান হতে পারবে বলে মনে করছেন ফিচ রেটিংসের বিশ্লেষক জেন ফ্রেডরিচ। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কম থাকলে আমদানিকারক দেশগুলোর ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে। তবে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় জ্বালানি তেল সংরক্ষণ সুবিধা সীমিত। ফলে এসব দেশ এ সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারবে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়।

লাভ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। কেননা দেশটি জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক রফতানি বাজার নিজেদের দখলে নিতে চায়। দাম কমলে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার আমদানিকারক দেশগুলো প্রভাবশালী এ উৎসের দিকে ঝুঁকবে বলে মনে করছে ওয়াশিংটন। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মিত্র দেশ সৌদি আরবের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের বাজার পরিস্থিতি নিম্নমুখী করার পেছনে মার্কিন প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

যদিও মার্কিন জ্বালানি বিভাগ এক বিবৃতিতে সাম্প্রতিক দরপতনের পেছনে রাশিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে ‘স্টেট ফ্যাক্টর বা রাষ্ট্রীয় একক’ জড়িত বলে অভিযোগ করেছে। এর বিপরীতে আলেকজান্ডার নোভাক বলেছেন, রাশিয়ার জ্বালানি খাতের সব ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা রয়েছে। এবং মস্কো যেকোনো মূল্যে এ সক্ষমতা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।

তবে লাভ যারই হোক, জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যযুদ্ধে আপাতদৃষ্টিতে ওপেকভুক্ত রফতানিকারক দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবারের রেকর্ড দরপতনে ওপেকভুক্ত দেশগুলোর একদিনেই ৫০ কোটি ডলারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে বাজারে অনিশ্চয়তা না কাটলে এ ক্ষতি আরো জোরালো হতে পারে বলে জানান জেন ফ্রেডরিচ। ইরানের বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আধিপত্য পোক্ত করতে সৌদি আরব জ্বালানি তেল নিয়ে এ অনিশ্চিত যুদ্ধে জড়িয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।

এদিকে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ না কমা এবং চলমান মূল্যযুদ্ধের জের ধরে স্বল্প সময়ের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস। এক নোটে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বছরের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) জ্বালানি তেলের ব্যারেল ৩০ ডলারের আশপাশে থাকতে পারে। ফলে জ্বালানি পণ্যটির বাজার পরিস্থিতি ফের ২০১৪ সালের পর্যায়ে অবস্থান করার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে ওপেক-নন ওপেক সহযোগিতার সম্পর্কও।

এ পরিস্থিতিতে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল বর্তমান পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে ‘সংযত আচরণ’ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চলতি বছর করোনাভাইরাস অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা প্রবৃদ্ধি এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্নে নামিয়ে আনতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বাজার ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে বিরোধ নয়, সবার ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ জরুরি।

ব্লুমবার্গ, রয়টার্স, মার্কেট ওয়াচ এবং অয়েলপ্রাইসডটকম অবলম্বনে

সূত্র : বনিক বার্তা