দুর্লভ বইয়ের দুনিয়া নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র

0
45

প্রতি মার্চে ম্যানহাটনে অনুষ্ঠিত হয় নিউইয়র্ক ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টিকোয়ারিয়ান বুক ফেয়ার। এ এক অদ্ভুত বইমেলা! দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে বই সংগ্রাহকরা হাজির হন দুর্লভ বই সংগ্রহ, বিক্রি করতে। মেলার চেহারাটা অনেকটা জাদুঘরের মতো হয়— ষোলো শতকের পাণ্ডুলিপি দেখা যায় এখানে, থাকে প্রাচীন মানচিত্র, ঐতিহাসিক দলিল, পুরনো ক্রাইম নভেলসহ আরো অনেক কিছু।

দুর্লভ বইয়ের একজন বিশিষ্ট ডিলারের সাক্ষাত্কার দেখা যায় ‘দ্য বুকসেলারস’ শিরোনামের প্রামাণ্যচিত্রের শুরুতেই। ৬ মার্চ মুক্তি পেয়েছে ‘দ্য বুকসেলারস’। ৯০ মিনিটের এ ছবি পরিচালনা করেছেন ডি.ডব্লিউ ইয়ং। নিউইয়র্ক ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টিকোয়ারিয়ান বুক ফেয়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মেলায় ঢুকে আপনার মনে হতে পারে এগুলো একগাদা পুরনো বাদামি রঙের বইয়ের স্পাইন। কিন্তু মূল ব্যাপারটা একেবারে উল্টো। পুরোটা এক অসাধারণ দৃশ্য।’ আরেকটা ব্যাপার এখানে ঘটে, যা হয়তো কেউ আশা করবেন না—দুর্লভ বইয়ের এ মেলায় স্পর্শানুভূতিও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় ওঠে।

দ্য বুকসেলারস-এর অন্যতম প্রযোজক জুডিথ মিজর্যাচি বলেছেন, ‘মেলার বইগুলো স্পর্শ করে আপনি বুঝবেন এগুলো কত কাল ধরে টিকে আছে।’ প্রামাণ্যচিত্রটির মুখ্য বিষয় হলো, বইয়ের টিকে থাকা এবং দুর্লভ বইয়ের বাণিজ্য। দুনিয়ার বইপ্রেমী, সংগ্রাহকদের খোরাক জুগিয়ে যান যে ডিলার, বিক্রেতারা তাদেরই তুলে আনা হয়েছে দ্য বুকসেলারস-এ।

স্যাংচুয়ারি বুকসের মালিক ড্যানিয়েল ওয়েশলার সাত বছর আগে দ্য বুকসেলারস প্রামাণ্যচিত্রের ধারণাটি নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি তার ধারণা শেয়ার করেন ইয়ং ও মিজর্যাচির সঙ্গে। ওয়েশলার আগেও এ দুজনের সঙ্গে একটি প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে কাজ করেছিলেন, সেটি ছিল নিউইয়র্কের এক স্ট্রিট ফটোগ্রাফারকে নিয়ে।

পরিকল্পনার কয়েক বছরের মধ্যে দ্য বুকসেলারসের কাজ শুরু হয়। কিন্তু শুরুতেই বড় কিছু বাধা হাজির হয়। দ্য বুকসেলারসের অন্যতম চরিত্রে ছিলেন ব্রিটিশ রক গিটারিস্ট এবং দুর্লভ বইয়ের ডিলার মার্টিন স্টোন। ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর তিনি প্রয়াত হন এবং এতে প্রামাণ্যচিত্রটির কাজ শুরুতেই হোঁচট খায়। একসময় ভাবা হয়েছিল মার্টিন স্টোন রোলিং স্টোনের ব্রায়ান জোনসের জায়গা নিয়ে নেবেন। কিন্তু তার পরিবর্তে স্টোন নেমে পড়েন দুর্লভ বইয়ের রহস্যময় দুনিয়ায়।

ওয়েশলার বলেন, ‘এ প্রজন্মগুলো বিকশিত হয়েছে ইন্টারনেটের যুগের আগে। আমরা যদি তাদের অবদানগুলোকে লিপিবদ্ধ করে না রাখি, তাহলে সেসব একদিন হারিয়ে যাবে।’

দ্য বুকসেলারসে দুর্লভ বই বিক্রেতাদের সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রাহক, নিলামকারী, কিউরেটরদের প্রতিও মনোযোগ দেয়া হয়েছে। পুরো প্রামাণ্যচিত্রটি দেখতে গিয়ে দর্শকরা একটি অন্তর্নিহিত সুরকে শুনতে পাবেন—দুর্লভ বইয়ের বেচাকেনার এ পেশায় শুধু ব্যবসা নয়, সঙ্গে থাকে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং বইয়ের প্রতি তীব্র আকর্ষণ।

পরিচালক ডিডব্লিউ ইয়ংয়ের কথায়, ‘বই বিক্রেতারা যা বিক্রি করেন তা অর্থমূল্যের চেয়ে বেশি কিছু। বই সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।’

৫২ বছর বয়সী ওয়েশলার তিন দশক আগে পুরনো-দুর্লভ বইয়ের ব্যবসায় যুক্ত হয়েছিলেন। কয়েক বছর আগে ওয়েশলার দুনিয়াজুড়ে আলোড়ন তুলেছিলেন। তিনি ১৫৮০ সালের একটি অভিধান খুঁজে পাওয়ার দাবি করেন, যেটা স্বয়ং শেক্সপিয়ার ব্যবহার করেছিলেন।

ওয়েশলারের দোকান স্যাংচুয়ারির অবস্থান ম্যাডিসন এভিনিউতে। তবে আর সব বইয়ের দোকানের মতো সবসময় খোলা থাকে না। কেবল কোনো ক্রেতার সঙ্গে অ্যাপয়েনমেন্টের পরিপ্রেক্ষিতেই দোকানটি খোলা হয়। দ্য বুকসেলারস প্রামাণ্যচিত্রে এ স্যাংচুয়ারির ভেতরের দৃশ্য দেখতে পাবেন। দেখা যাবে জেমস কামিনস নামে এক ডিলারের গুদামঘর, যেখানে তিন লাখের বেশি বই আছে। অনেকে বলেন, কামিনসের গুদামঘর হলো লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসের বর্ণনা করা অসীম গ্রন্থাগার লাইব্রেরি অব বাবেলের প্রতি জবাব।

দ্য বুকসেলারসে একটি অংশ আছে একজন প্রয়াত একাডেমিকের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি নিয়ে। সে দৃশ্যধারণের স্মৃতিচারণ করে পরিচায়ক ইয়ং বলেছেন, ‘পুরো লাইব্রেরিতে একটা বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল—ছত্রাক, ভাঙা জানালা। সবখানে শুধু বই আর বই।’

ছবিতে দেখানো হয়েছে কীভাবে ইন্টারনেট পুরনো বইয়ের ব্যবসাকে ‘ধ্বংস’ করে দিয়েছে। তবে পরিচালক কিছু আশার জায়গাও দেখিয়েছেন। নতুন বিক্রি পদ্ধতি, নতুন ধরনের সংগ্রহ প্রভৃতি। ব্রুকলিনভিত্তিক হানি অ্যান্ড ওয়্যাক্স বুকসেলারসের হিদার ও’ডনেল বলেন, ‘ছবিতে একটা বিষয় তুলে আনা হয়েছে, যা আমি খুব পছন্দ করি। বই বিক্রির বিষয়টা বিভিন্নভাবে করা যায়। এটা কোনো গোপন অভিজাত ক্লাবের কাজ নয়।’ ও’ডনেলকে দ্য বুকসেলারসেও দেখা যাবে। তিনি সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে একটি দুর্লভ বই বিক্রির জন্য পোস্ট দিয়েছেন। এতে বিশ্বযুদ্ধের আগের ইউরোপের সাত হাজার অলঙ্করণ আছে। এসব এঁকেছেন এক অজানা সুইস শিল্পী এবং অলঙ্করণগুলোর শিরোনাম তিনি দিয়েছেন এক কাল্পনিক ভাষায়।

ও’ডনেল মনে করেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বই বিক্রির ধারণাকেই বদলে দিয়েছে।

সুত্র : বনিক বার্তা