কোন দিকে যাবে দর্শক?

0
13

সময়ের সঙ্গে বদলেছে দর্শকদের রুচি। বদলেছে নাটক, টেলিছবি, সিনেমা বা অন্যান্য অনুষ্ঠান দেখার ধরনও। একটা সময় টিভি পর্দার মাঝেই বন্দী ছিল বিনোদনের এই খোরাকগুলো। এরপর ড্রয়িংরুমের বোকা বাক্স চলে এলো হাতের মুঠোয়। জনপ্রিয় হয়ে উঠলো ইউটিউব। অনুষ্ঠানগুলো মুক্তির পরপরই এটি চলে আসতে লাগলো ইউটিউবে। একটা সময় টেলিভিশনের দর্শকরা ইউটিউবের দিকেই ঝুঁকতে শুরু করলো।

সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে নির্মাতা, প্রযোজক কিংবা টেলিভিশনগুলো চালু করলো নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল। প্রচারিত নাটকগুলো তারা প্রকাশ করতে লাগলো তাদের চ্যানেলে। আর এসব ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবারও বাড়তে থাকলো ঝড়ের গতিতে। অনেকে আবার শুধুমাত্র ইউটিউব কেন্দ্র করেই নির্মাণ করতে লাগলেন নানা অনুষ্ঠান। কালের বিবর্তনে পাল্টে যাচ্ছে এই মাধ্যমের ওপর নির্ভরতাও।

ইউটিউবকে পেছনে ফেলে অনলাইন দুনিয়ায় এখন জায়গা করে নিচ্ছে অ্যাপভিত্তিক সেবা হইচই, আইফ্লিক্স, বাংলাফ্লিক্স, মুভি প্লে, পপকর্ন টাইম, বায়োস্কোপসহ অসংখ্য অনলাইন প্লাটফর্ম। ফলে পছন্দের নাটক, টেলিছবি কিংবা সিনেমা দর্শকরা পাচ্ছেন এসব অ্যাপসে।

বিভিন্ন অ্যাপসের ভিড়ে দর্শক হারিয়ে ফেলছেন তাদের পছন্দের অনুষ্ঠানগুলো। কারণ মুঠোফোনে সবগুলো অ্যাপস ডাউনলোড করে রাখা মানুষের সংখ্যা নেই বললেই চলে। এর মধ্যে রয়েছে ‘টাকা দিয়ে দেখা’র হিসাবটাও। এসব অ্যাপসে প্রচারিত নাটক, টেলিছবি বা সিনেমা কিছু থাকে ফ্রি। আর কিছু দেখতে হয় টাকা দিয়ে বা নির্দিষ্ট মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। আবার এমন কিছু অ্যাপস আছে, যেখানে বাৎসরিক চার্জ দিয়ে তবেই প্রবেশ করতে হয় সেখানে।

বিষয়টি নিয়ে একজন দর্শক বলেন, ‘পছন্দের নাটক বা ছবি কোনো একটি অ্যাপসে প্রকাশ করা হলো। সেই অ্যাপসটি আমার ফোনে ডাউনলোড করা নেই। এটি দেখার জন্য অ্যাপসটি ডাউনলোড করলাম। কিন্তু দেখা যায়, সেখানে টাকা চাচ্ছে। যাই হোক, টাকা দিয়েই পছন্দের অনুষ্ঠানটি দেখলাম। এবার আরেকটি পছন্দের নাটক অন্য কোনো একটি অ্যাপসে প্রকাশ হলো। এবার সেটি দেখার জন্যও ঠিক একই কাজ করতে হচ্ছে। এত অ্যাপস নামিয়ে কি আর নাটক দেখা যায়? ফলে অনেক ভালো নাটক বা ছবি থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।’

কোনো কোনো দর্শকদের মতে, অনলাইনে অনুষ্ঠানগুলো আসার ফলে তারা যে কোনো সময় এটি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। অবসরের সময়গুলোতে তারা তাদের পছন্দের নাটকগুলো দেখে নিচ্ছেন। আর অনলাইন প্লাটফর্মগুলো থাকার কারণে নির্দিষ্ট একটি ঠিকানায় বিনোদনের বিষয়গুলো তারা খুঁজে পাচ্ছেন। তবে কিছু কিছু প্লাটফর্মে বিজ্ঞাপন দৌরাত্ম্য হতাশ করেছে তাদের। এ ছাড়াও এই মাধ্যমকে আরও মানসম্মত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তবে বেশির ভাগ দর্শকই হতাশ হয়েছেন পছন্দের অনুষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্লাটফর্মে থাকার কারণে। যা খুঁজে পেতে বা দেখতে গিয়ে নিরাশ হচ্ছেন তারা।

এদিকে,টেলিভিশনে প্রচারিত প্রায় সবগুলো নাটকই পরবর্তী সময়ে পাওয়া যায় ইউটিউবে। কিন্তু এমন অসংখ্য নাটক তৈরি হয় যা শুধুমাত্র অনলাইনকে কেন্দ্র করে। যা নির্দিষ্ট অনলাইন প্লাটফর্মে প্রচার করা হয়। ফলে অনেক নাটকই দর্শকদের নজরের বাইরে রয়ে যায়। আর যা-ও পাওয়া যায়, সেখানে টাকার অঙ্ক থাকার কারণে সেটি থেকে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নেয়।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় জনপ্রিয় নির্মাতা অমিতাভ রেজার সঙ্গে। দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘ব্যাঙের ছাতার মতো এখন অসংখ্য অনলাইন প্লাটফর্ম তৈরি হয়েছে। আগে এগুলোকে নীতির মধ্যে আনতে হবে। এসব প্লাটফর্মের কারণে মানহীন কাজের মাঝে মানসম্মত কাজ হারিয়ে যাচ্ছে। সব কনটেন্ট তো আর সব সাইটে পাওয়া যাবে না। যারা ভালো কাজের মূল্য দেবে, গল্প তাদের সাইটেই যাবে। একটা সময় অনলাইন দুনিয়ায় কিছু কিছু অ্যাপসই টিকে থাকবে। বাকিরা ঝরে পড়বে।’

নির্মাতা মাবরুর রশিদ বান্নাহ বলেন, ‘পৃথিবীর কোথাও আমাদের দেশের মতো ফ্রি বিনোদন নেই। একটা কাজ তৈরি করতে টাকা লাগে। এবার সেই কাজটি যদি আপনি একেবারে ফ্রি দেখেন, তাহলে কীভাবে হবে? আমাদের ফ্রি দেখার মনোভাব বদলাতে হবে। এখন যে নিয়মের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রি আসছে, আমি একে সাধুবাদ জানাই। আর শত শত অ্যাপসের মধ্যে দর্শক যখন নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপসে বেশি যাবে, তখন অন্যদের হয়তো ভালো করতে হবে নয়তো বন্ধ করে দিতে হবে।’

এ বিষয়ে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বলেন, ‘আমরা প্রথম যে ভুলটি করেছি, তা হলো ফ্রি দেওয়া। আমাদের দর্শকরা ফ্রি দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তাই টাকা দিয়ে দেখার প্রতি আমাদের বড্ড অনিহা। চলচ্চিত্র শিল্পটা তো ধ্বংস হওয়ার পথে আর নাটকের বাজারটা তো আমরা আগেই ধ্বংস করেছি। চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত নাটকগুলোর একটা মানদণ্ড থাকে। কিন্তু শুধুমাত্র অনলাইন প্লাটফর্মে প্রচারিত নাটকগুলোর কোনো মানদণ্ড নেই। তাই যে যা খুশি সেখানে প্রচার করছে। একেবারে হ-য-ব-র-ল অবস্থা। আমি মনে করি, এগুলোও নীতির মধ্যে আনতে হবে। তাহলে মানসম্মত কাজ দর্শকদের সামনে আসবে। আর দর্শকও তখন নির্দিষ্ট কিছু অনলাইন প্লাটফর্মে তাদের পছন্দের গল্পগুলো খুঁজবে।’